সময় লাগত দু’দিন! ১০০ বছর আগে এভাবে যেতে হত দিঘা, শুনলে যাওয়ার নাম নেবেন না

ঘুরতে (Travel) যাওয়ার প্রসঙ্গ উঠবে আর দিঘা (Digha) নিয়ে আলোচনা হবে না তা কি কখনও হতে পারে। বাঙালিদের ভ্রমণ নিয়ে আলোচনা দিঘা ছাড়া এক কথায় অসম্পূর্ণ। এই দিঘা হল বাঙালিদের কাছে একটা আলাদাই ইমোশনের জায়গা। বছরের যে কোনও সময়ে মানুষ কয়েকটা দিনের ছুটি হাতে পেলেই মানুষ এখানে যেতে পছন্দ করেন। দিঘা বিভিন্ন ভাবে যেতে পারা যায়। সড়কপথ, রেলপথ দুটিতেই। তবে অবশ্য এক বিশেষ কারণবশত দিঘা অবধি হেলিকপ্টার পরিষেবাটি বন্ধ রয়েছে। যাইহোক, আপনার কাছে যদি চার চাকা বা দু’চাকা থেকে থাকে তাহলে আপনিও একজন মজা করতে করতে দিঘা পৌঁছে যেতে পারেন।

দিঘা যেতে সময় লাগত দুদিন?

আচ্ছা তবে আপনার মনে কি একবারও এই প্রশ্নটা জেগেছে যে আজ থেকে ঠিক ১০০ বছর আগে দিঘা কীভাবে যাওয়া যেত? কী প্রশ্নটা শুনে চমকে গেলেন তো? তাহলে এর উত্তর জানতে এই প্রতিবেদনটিতে টিকে থাকুন। আপনি কি জানেন যে ১০০ বছর আগে কলকাতা থেকে দিঘা পৌঁছাতে দু’দিন সময় লাগতো? ১০০ বছর আগে দিঘা নামে পরিচিত জায়গাটি বর্তমানে সমুদ্রের নীচে রয়েছে?

দিঘার আগের নাম ছিল বীরকুল

   

আজ থেকে ১০০ বছর আগে দিঘা থেকে একটি সমুদ্র পার্শ্ববর্তী গ্রাম। জায়গাটির নাম ছিল বীরকুল পরগণা। তবে বর্তমানে সেই জায়গাটির হদিশ পাওয়া মুখের কথা না। কারণটা জানলে আপনি চমকে যাবেন। বলা হয়, এই বীরকুল পরগণা সমুদ্রের নীচে তলিয়ে গিয়েছে। দিঘার ইতিহাস কিন্তু গড়ে উঠেছিল এই বীরকুল পরগণা থেকেই। ১৭৭৫ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস বীরকুলে গরমের ছুটি কাটানোর জন্য একটি বাংলো তৈরি করেন। সমুদ্র স্নান, মাছ ধরা সহ বিভিন্ন কাজের লক্ষ্যে বীরকুলের সৈকতে একটি বিশ্রামাগার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এই জায়গাটিকেই ওয়ারেন হেস্টিংস বলতেন ‘Brighton of the East’। যদিও পরবর্তী সময়ে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও ভূমিক্ষয়ের কারণে এই বীরকুল ভগ্নস্তুপে পরিণত হয়। হেস্টিংসের সাধের বাংলোটিও সমুদ্রের গর্ভে বিলীন হয়ে যায় বলে শোনা গিয়েছে। ১৭৮০ সালে পূর্ব মেদিনীপুরে যাতায়াত ব্যবস্থা বলতে ছিল হাতি, ঘোড়ার গাড়ি, গরু গাড়ি ও নৌকো। তবে আপনি জানলে অবাক হবেন, আজ থেকে ১০০ বছর আগের চিত্রটা একটু অন্যরকম ছিল। সেইসময়ে দিঘা যাওয়া সাধারণ মানুষের কাছে একপ্রকার ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল।

digha

কলকাতায় বসবাসকারী সাহেবদের ছুটি কাটানোর অন্যতম সেরা ঠিকানা ছিল এই দিঘা। সাহেবরা কিছুটা পথে হাতি, ঘোড়া তো কিছুটা পথ নৌকো করে আসতেন। সেইসময়ে সাহেবদের থাকার জন্য দিঘার বালিয়াড়িতে গড়ে উঠেছিল কিছু ছোটোখাটো বাংলো। যদিও ১৯১১ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার কলকাতা থেকে দিঘার সড়কপথে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি করার চেষ্টা করে। যদিও এই ব্যবস্থা বিশ বাঁও জলে চলে যায়।

এরপর ১৯২১ সালে দিঘায় আসেন কলকাতার বিখ্যাত হ্যামিল্টন কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা জন স্নেইথ।তিনি প্রথমে ওভারলেন গাড়ি করে বেলডা এরপর বেলডা থেকে ঘোড়ার পিঠে চেপে কাঁথিতে এরপর সেখান থেকে হাতির পিঠে চেপে দিঘায় পৌঁছান। প্রথমবার দিঘায় এসে তার প্রেমে পড়ে যান জন। তিনি সিটার প্লেনে চেপে মাঝে মধ্যেই দিঘায় আসতেন নিজের বাংলোয়।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দিঘাকে সৈকতনগরী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য জন আবেদন জানান তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের কাছে। এরপর ধীরে ধীরে তৈরি হয় সৈকতাবাস সহ আরও নানা ব্যবস্থা। ১৯৬২ সালে বিধানচন্দ্র রায় মায়ের নামে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরি করা হয় দিঘায়। ১৯৫০ সালে খড়গপুর থেকে দিঘার উদ্দেশ্যে প্রথম পিচের রাস্তা তৈরি করা হয়। সেইসময়ে দিঘায় আসতে হলে কলকাতা থেকে খড়গপুর ট্রেনে এরপর সেখান থেকে বাসে করে কাঁথি। তারপর বাস বদলে দিঘা পৌঁছাতে হত মানুষকে।

এই বাসগুলির চেহারা এখনকার মতো মোটেই ছিল না। বাসগুলির ইঞ্জিন ছিল সাদা রঙের। যে কারণে বাসের সামনের বেশ কিছুটা অংশ বাইরে বেরিয়ে থাকত। এই বাসের মধ্যেও ছিল ফার্স্ট ক্লাস, সেকেন্ড ক্লাস এবং থার্ড ক্লাসের ব্যবস্থা ছিল। শুনতে অবাক লাগলেও এটাই সত্যি। ১৯৭০ সালের পর থেকে সড়কপথে যাতায়াতের উন্নতি ঘটতে শুরু করে। নন্দকুমার থেকে কাঁথি হয়ে সড়কপথ গড়ে ওঠে। যে কারণে কলকাতা ও দিঘার মধ্যেকার দূরত্ব প্রায় ৭০ কিমি মতো কমে যায়।

সম্পর্কিত খবর