একসময় ভারতকে ভিখারিদের দেশ বলেছিল আমেরিকা, আজ ভারতের সামনে পাতছে হাত

ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির জেরে কিছুদিন আগেই ভারত সরকারের গম রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করার সিদ্ধান্ত নিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছে। ভারত সরকারের এই সিদ্ধান্তে বিশ্বজুড়ে চলা খাদ্যসংকট যে আরো বাড়বে, সেইরকমই মন্তব্য করে আমেরিকা সহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলি। আপনাদের জানিয়ে রাখি সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশের মধ্যে গম, আটা এবং অন্যান্য খাদ্যশস্যের ক্রমবর্ধমান মূল্য যাতে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। কিছুদিন আগেই জার্মানিতে জি-৭ বৈঠকে, মার্কিন কৃষি সচিব টম ভিলস্যাক ভারতের এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে এটিকে “ভুল সময়ে ভুল পদক্ষেপ” বলে অভিহিত করেছেন।

গত ১৩ মে, গম রপ্তানি নিষিদ্ধ করে ভারত। এদিকে বিশ্বজুড়ে এই খাদ্য সংকটের মাঝেই এই সিদ্ধান্তের ফলে ভুগতে হতে পারে অনেক সাধারন মানুষকেও। আসলে বর্তমানে যুদ্ধরত দুই দেশ ইউক্রেন এবং রাশিয়া সারা বিশ্বে গম রপ্তানিতে খুব গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে। কিন্তু দু’দেশই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় বিশ্বজুড়ে লাগাম ছাড়া হয়েছে খাদ্যশস্যের দাম।

ভারত সরকারের গম রপ্তানি নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তের ওপর নিজেদের স্পষ্ট বিরক্তি প্রকাশ করেছে আমেরিকা সহ বিশ্বের উন্নত সব দেশ। কিন্তু জানেন কি, কিছু বছর আগেও এমন সময় এসেছিল যে, এই আমেরিকাই গমের জন্য ভারতকে হুমকি দিত। আসলে সেই সময় ভারত গমের জন্য নির্ভর ছিল মার্কিনদের ওপর। এমনকি ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে আমেরিকা ভারতকে গম না দেওয়ার হুমকি অবধি দেয়। শুধু তাই নয়, একসময় আমেরিকা ভারতকে এই গম্যার জন্য ‘ভিক্ষুকের দেশ’ বলে অ্যাখ্যা দিয়েছিল।

দেশকে খাদ্য শস্যের ওপর স্বনির্ভর করে তুলতে প্রথম পদক্ষেপ নেন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী। ক্ষমতায় এসেই তিনি দেশের কৃষিখাতে বাজেটের পরিমাণ বাড়িয়ে দেন অনেকটা। কিন্তু যতদিন না পর্যন্ত না দেশ খাদ্যশস্য উৎপাদনে সম্পূর্ন স্বনির্ভর হচ্ছে ততদিন অবধি প্রয়োজন ছিল খাদ্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। আমেরিকা থেকে খাদ্যশস্যের আমদানির জন্যই তৎকালীন খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রকের দায়িত্ব পেয়ে সুব্রহ্মণ্যম স্বামী আমেরিকা সফর করেন। এরপর আমেরিকা থেকে গম এনে এই খাদ্য সমস্যা থেকে তাৎক্ষণিক মুক্তি মেলে দেশের। যদিও শাস্ত্রীজি সেইসময় একই সাথে দূরদর্শী চিন্তাভাবনা করে ভবিষ্যতে যাতে ভারত খাদ্য দ্রব্যের ব্যাপারে স্বয়ং সম্পূর্ণ হতে পারে সেই পদক্ষেপ নিচ্ছিলেন।

কিন্তু এরপর ১৯৬৫ সালের ৫ আগস্ট পাকিস্তান ভারতকে দুর্বল মনে করে ভারতে হামলা করার পরিকল্পনা করলে ভারত এবং পাকিস্তানের সাথে শুরু হয়ে যায় যুদ্ধ। এবং এই আবহেই ভারতকে হুমকি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসন। এমনকি তিনি এও বলেন যে, যুদ্ধ বন্ধ না হলে গম সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হবে। কিন্তু তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পদে ছিলেন লালবাহাদুর শাস্ত্রী, তিনি আমেরিকার এই চাপের সামনে নিজের মাথা নত করেননি।

আমেরিকার এই হুমকির পর ১৯৬৫ সালে দশেরার দিনে রামলীলার ময়দানে প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী একটি সমাবেশের আয়োজন করেন। যেখানে ওই সমাবেশে তিনি স্লোগান দেন, “জয় জওয়ান-জয় কিষাণ”। ওই সমাবেশেই প্রধানমন্ত্রী শাস্ত্রী দেশবাসীর কাছে সপ্তাহে একবেলার খাবার না খাওয়ার আবেদন করেন। শুধু তাই নয়, নিজেও একবেলার খাওয়া ছেড়ে দেন।

পরবর্তিতে নতুন খাদ্য শস্যের চুক্তির প্রয়োজনে ইন্দিরা গান্ধী আমেরিকা সফরে গেলে আলাবামার একটি সংবাদপত্র ইন্দিরা গান্ধীর এই সফরের ব্যাপারে শিরোনাম দেন যে, “ভারতের নতুন প্রধানমন্ত্রী খাদ্যশস্য ভিক্ষা করতে আমেরিকায় আসছেন।” চুক্তি সম্পন্ন হলেও তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জনসন বলেছিলেন, ‘আমেরিকা থেকে হাজার হাজার শ্রমিককে ভারতে পাঠানো উচিত তাঁদের কৃষিকাজ শেখানোর জন্য।’

wheat

এরপর ১৯৬৫ এবং ১৯৬৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারত প্রায় ১৫ মিলিয়ন টন গম আমদানি করে। যা ইতিহাসের পাতায় PL480 নামেই পরিচিত। এই খাদ্য শস্য দিয়েই প্রায় ৪ কোটি ভারতীয়দের পেট ভরত। তাই দেখে মার্কিন কৃষি বিভাগ সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে ভারতের উদ্দেশ্য ব্যঙ্গ করে লেখে যে, “হিন্দুস্তান ভিক্ষুক ও নিঃস্বের দেশ।”

➦ আপনার জন্য বিশেষ খবর

Back to top button